InstaForex

আত্মহত্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে

আত্মহত্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে

Sucide
দেশে আত্মহত্যা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। নিছক কোনো ঘটনা নিয়ে ঝগড়া বা অভিমানে বিষপান, গলায় ফাঁস লাগিয়ে, চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে, ঘুমের বড়ি খেয়ে, শরীরে আগুন লাগিয়ে এবং নদীতে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করছে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবার, সমাজ, এমনকি রাষ্ট্রেও। 
Sucide-3

এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৮ জন নারী-পুরুষ ও শিশু আত্মহত্যা করছে। বয়স্ক নারী-পুরুষের পাশাপাশি স্কুল-কলেজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেধাবী শিক্ষার্থীরাও আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকছে। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে গত ৬ বছরে সারা দেশে ৫৯ হাজার ৭৬০টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। বেসরকারি হিসাবে প্রতি বছর সারা দেশে ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে থাকে। কিন্তু আত্মহত্যা প্রতিরোধে সরকারি পর্যায়ে কোনো জনসচেতনতামূলক পদক্ষেপ এ পর্যন্ত নেয়া হয়নি। ৬৪টি জেলার মধ্যে ঝিনাইদহ জেলায় আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। 

Sucide-0
যে কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই জেলায় আত্মহত্যার এই প্রবণতার ওপর গবেষণা চালাতে পুলিশের আইজিপিকে নির্দেশ দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক অশান্তি, মাদকাসক্তি, মানসিক সমস্যা, হতাশা, বেকারত্ব, প্রেম, পরকীয়া, নারী-উত্ত্যক্ত করা, পড়ালেখা নিয়ে শাসন, মা-বাবার বিচ্ছেদ, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া, পারিবারিক শৃঙ্খলা নষ্ট হওয়া ইত্যাদি নানা কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। তারা বলছেন, আত্মহত্যার প্রবণতারোধে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নতুবা ভবিষ্যতে এ ঘটনা রাষ্ট্রে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দেবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাজ ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জনসচেতনতামূলক শিক্ষা প্রদান এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। 

Sucide-4
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আত্মহত্যার ভয়াবহতা ও প্রতিরোধের নানা দিক নিয়ে সভা-সেমিনার চালু করা দরকার। এছাড়া গণমাধ্যমসহ আরও নানা অঙ্গনে আত্মহত্যার ভয়াবহতা এবং প্রতিকারের উপায় নিয়ে বিশেষ প্রচারণা চালাতে হবে। মানসিক রোগ চিকিৎসকদের মতে, যারা আত্মহত্যা করে বা আত্মহত্যার চেষ্টা করছে বা চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছে তাদের বেশির ভাগই কোনও না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। কাউন্সিলিং এবং যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে আত্মহত্যার পথ থেকে তাদের ফেরানো সম্ভব। কিন্তু দেশে মানসিক রোগের চিকিৎসাব্যবস্থাও খুবই অপ্রতুল। সরকারি হিসাবে দেশে মানসিক রোগের চিকিৎসক সংখ্যা দুই শতাধিক। এটা পর্যাপ্ত নয়।

Sucide-2
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ডাক্তাররা জানান, প্রতিদিন গড়ে ৪ জন আত্মহত্যার চেষ্টাকারী রোগী এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছে। এসব রোগীর অধিকাংশই রাজধানী ও আশপাশের। পুলিশ সদর দপ্তরের গত ৬ বছরের হিসাবে দেখা যায়Ñ গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ৩৩ হাজার ৪২৩টি। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ৪ হাজার ৬২২, ২০১০ সালে ৪ হাজার ৬৭৯, ২০১১ সালে ৫ হাজার ৯৬, ২০১২ সালে ৫ হাজার ৯০৩, ২০১৩ সালে ৬ হাজার ৪১৭ এবং ২০১৪ সালে ৬ হাজার ৭০৬টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে বিষপানে গত ৬ বছরে ২৬ হাজার ৩৭৭টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ৫ হাজার ৩৮৮, ২০১০ সালে ৪ হাজার ৯৮৬, ২০১১ সালে ৪ হাজার ৫৪৬, ২০১২ সালে ৪ হাজার ২০৫, ২০১৩ সালে ৩ হাজার ৭১২ এবং ২০১৪ সালে ৩ হাজার ৫০০টি ঘটনা ঘটে। গত ৬ মাসে ধর্ষণের শিকার হয় ৩২৬ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ২৯ জনকে। আত্মহত্যা করেন একজন। যৌন হয়রানির কারণে ৬ জন নারী আত্মহত্যা করেন। এছাড়া যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হন ১৩৩ জন। হত্যা করা হয় ৯১ জন নারীকে। এ কারণে আত্মহত্যা করেন ৪ জন। যৌতুকের কারণে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন ৩৭ জন। পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হন ২০০ জন। এর মধ্যে ১৪৮ জনকে হত্যা করা হয়। এ ধরনের নির্যাতনে আত্মহত্যা করেন ৩২ জন। গত ৭ মাসে আত্মহত্যা করেন ৫৩ জন। 

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৭ মাসের মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাতে এসব তথ্য দেওয়া হয়। যৌতুক, স্বামীর পরকীয়াসহ দাম্পত্য কলহের জের ধরে তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ডাক্তাররা বলেছেন, দেশে ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সি মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। প্রতি লাখে ৭ দশমিক ৮ জন আত্মহত্যায় মারা যায়। আত্মহত্যাকারীদের প্রায় ৭৮ শতাংশ নারী। যৌতুক, দাম্পত্য কলহ, অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণ, প্রেম, সম্পর্কে জটিলতা, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া ও অর্থনৈতিক সংকট আত্মহত্যার প্রধান কারণ। তিনি বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এছাড়া সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করতে হবে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অতিমাত্রায় বিষণœতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হন। তরুণ প্রজন্ম সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। তরুণ-তরুণীরা তাৎক্ষণিক আবেগতাড়িত হয়ে আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যার বিরুদ্ধে স্পষ্ট আইনও রয়েছে দেশে। কেউ আত্মহত্যার ব্যর্থ চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারায় মামলা করার বিধান রয়েছে। যেখানে আত্মহত্যার চেষ্টাকারীর বিরুদ্ধে জেল-জরিমানা করা যায়। কিন্তু অধিকাংশ ঘটনাতেই মামলা হয় না। এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, মানবিক কারণেই সাধারণত মামলা হয় না। আর মামলা করে আত্মহত্যা ঠেকানো দুরুহ। এর জন্য দরকার সামাজিক সচেতনতা। বেশির ভাগ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে পারিবারিক কলহ, প্রেম-পরকীয়া কেন্দ্র করে।
Share on Google Plus

About Unknown

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment