সরকার আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে চাইছে দেশের সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে। পাশাপাশি ওই নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন সেক্টরের আলোচিত, জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরও নিয়ে আসা হতে পারে। তারা সরকারি দল ছাড়াও যেকোনো দল থেকে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। কেউ কোনো দলের ব্যানারে যেতে না চাইলে স্বতন্ত্র কিংবা নিজেরা নতুন দল করে নির্বাচন করতে চাইলে সেই সুযোগও পেতে পারেন। এছাড়াও এখন যেসব দল কোনো জোটে নেই, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ওই দলের প্রধান, বিভিন্ন সময় সরকারের দায়িত্ব পালন করেছেন কিংবা সংসদ সদস্য ছিলেন। তাদেরও সুযোগ দেওয়া হবে। সেই ভিত্তিতে নির্বাচনকালীন সরকার হতে পারে বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে। এই নির্বাচনের পর বিজয়ীদের নিয়ে সব দলের অংশগ্রহণে সর্বদলীয় সরকার কিংবা জাতীয় সরকার গঠনের চিন্তা রয়েছে। সেই পরিকল্পনা নিয়ে এখন সরকার এগোচ্ছে। সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে এই সর্বদলীয় সরকার গঠন হতে পারে। সরকার গঠনের পর ওই সংসদ ও সরকার আড়ম্বরপূর্ণভাবে ২০২১ সালে পালন করবে বাংলাদেশের পঞ্চাশতম জš§দিন। ২০২০ সালের ১৭ মার্চ পালন করবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জš§শতবার্ষিকী। তা পালন করার জন্য এখন থেকেই নানা ধরনের পরিকল্পনা চলছে। সূত্র জানায়, একাদশ সংসদ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে ও ওই সরকারের প্রধান হিসাবে শেখ হাসিনা এ দুটি অনুষ্ঠান পালন করবেন। তিনি দেশে ও বিদেশে সবার কাছে এটাই তুলে ধরতে চাইছেন আওয়ামী লীগই সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। যে দলটি বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। ব্যক্তিগত সাফল্য ছাড়াও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট টানা তিনবারের মতো সরকার গঠন করার যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা রাখে, সেটাও প্রমাণ করতে চাইছেন। কেউ কেউ বলছেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনুকরণে একটি নির্বাচনের দিকে হয়তো যাচ্ছে দেশ। সূত্র মতে, দেশের উন্নয়নের জন্য ও সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার উদ্যোগ নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসাবে উন্নীত করার জন্য প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেবেন। এদিকে ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জয় পায় বিএনপি। ৭৯, ৩৪, ২৩৬ ভোট পেয়ে তারা ওই সব আসনে জয় পায়। প্রাপ্ত ভোট ছিল ৫১.৩ ভাগ। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩৯টি আসন পায়, এর আগে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৯৩টি আসন পেয়েছিল। ’৭৯-র নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৪৭,৩৪,২৭৭ ভোট পায়। যা ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ। ওই নির্বাচনে ভোটার ছিল মোট ৩ কোটি ৮৩ লাখ ৬৩ হাজার ৮৫৮। ভোট প্রদান করেন ১,৯৬,৭৬,১২৪ জন। ওই নির্বাচনে ২৮টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। এরমধ্যে তিনটি দল পুরনো। আর ২৫টি রাজনৈতিক দল নতুন। যদিও ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে সাতটি দল প্রতিদ্বন্ধিতা করেছিল। কিন্তু বাকশাল হওয়ার পর আর তাদের কর্মকাণ্ড করার সুযোগ ছিল না। জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ১৯৭৮ সালের ৩০ জুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে। ১০ জন এতে প্রার্থী হন। ৭৬.৬ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন তিনি। জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর নতুন নতুন দলেরও জš§ হয়। ওই সংসদে ১১টি দল থেকে সংসদ সদস্য হিসাবে সংসদে বসার সুযোগ পায়। যারা বসেছিলেন তারা ওই সময়ের বিএনপি ছাড়াও আলোচিত সব নেতারা। রাজনীতিবিদদের মধ্যে সফল ও আলোচিত সবাইকে সংসদে আনার চেষ্টা করেন জিয়াউর রহমান। সফলও হন। সমঝোতার ভিত্তিতেই নির্বাচিত করেও আনা হয়। ওই সময়ে ওই সংসদে সরকারের বিরুদ্ধে অনেক সমালোচনাও হয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও সেই রকমই হতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেছেন, জাতীয় সরকার হবে কিনাÑ এটা আমি এখনই বলতে পারবো না। তবে এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি নির্বাচন হবে সংবিধানের বর্তমান বিধান মতে। শেখ হাসিনা সরকারপ্রধান। সংবিধানের কোনো কিছুতে বিএনপির দাবি অনুযায়ী কোনো পরিবর্তন আসবে না। সরকার সব দলকে নিয়ে নির্বাচন করবে। কাউকে মাইনাস করে নির্বাচন সরকার করতে চায় না। কেউ যদি আদালতের দ্বারা অযোগ্য হন সেটাতো আর সরকারের কোনো হাত নেই। তিনি বলেন, আপনারা যে পরিকল্পনা করার কথা বলছেন সেটা হবে কিনা এটাও অনেকটা অ্যাডভান্স হয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনতো ২০১৯ সালে। সরকারের একটি সূত্রে জানায় গেছে, শেখ হাসিনা বিএনপির ব্যাপারে নমনীয় ছিলেন সব সময়। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর চেয়েছিলেন বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা করে জাপানের প্রধানমন্ত্রী অ্যাবের মতো একটি আগাম নির্বাচন করতে। সেটা ২০১৬-২০১৭ এরমধ্যে। কিন্তু বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে তার সমঝোতার সম্ভাবনা থাকলেও কোকো মারা যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক জানাতে গেলে তাকে খালেদার অফিসের গেটের বাইরে থেকে বিদায় দেওয়া হয়। তাকে অনেকটা অপমান করার কারণেই সেই সম্ভাবনা ভেস্তে যায়। প্রধানমন্ত্রী ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগেও খালেদা জিয়াকে ফোন করে দাওয়াত দেন। তিনি কর্মসূচির দোহাই দিয়ে দাওয়াতে যাননি। দুটি ঘটনায় শেখ হাসিনা বেশ আহত হন। এই কারণে তিনি আর খালেদা জিয়ার সঙ্গে কোনো সমঝোতার উদ্যোগ নিতে চাইছেন না। তার তরফ থেকে কেউ খালেদা জিয়ার সঙ্গে সমঝোতা করুক সেটাও তিনি চাইছেন না। আর ব্যক্তিগতভাবে তারেক রহমানের ব্যাপারে তিনি ২১ আগস্টের ঘটনার কারণে নাখোশ। এ কারণে ওই দুজনের সঙ্গে তিনি কোনো সমঝোতা চান না। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সেই হিসাবে সংসদের পরবর্তী নির্বাচন অর্থাৎ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০১৮ সালের অক্টোবরের পর থেকে ২০১৯ সালের জানুয়ারির মধ্যে। সূত্র জানায়, আগাম নির্বাচন নিয়ে সরকার নানা পরিকল্পনা করছেন। এরমধ্যে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন ও সর্বদলীয় সরকার গঠন একটি অপশন। সেই হিসাবে আগামী ২০১৭ সালের মধ্যেই সর্ব দলীয় সরকার গঠনের সব পরিকল্পনা সম্পন্ন করা হবে। ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে সরকারের ও সরকারি দলের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনাও শুরু হয়েছে। আগামী দেড় বছরের মধ্যে এসব আলোচনা সফল হলে এবং কোনো কোনো দল কত আসন পাবে সেটা নিশ্চিত হয়ে গেলে নির্বাচনেরও সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা শুরু হতে পারে। নতুন নতুন বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলেরও জš§ হতে পারে। ওই সব দল হতে পারে বিশেষ বিশেষ কয়েকজনকে দিয়ে যারা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। এরমধ্যে অধ্যাপক বি চৌধুরী, ড. কামাল হোসেনের মতো ব্যক্তিত্ব ছাড়াও রাজনীতিতে আছেন বা রাজনীতিতে সক্রিয় নন তারাও যেমন ফজলে হাসান আবেদসহ অনেককেই আনা হতে পারে । যারা বিএনপি, আওয়ামী লীগ কিংবা অন্য দলের ব্যানারে রাজনীতিতেও যেতে চাইবেন না। বিএনপি চেয়ারপারসন আদালতের মাধ্যমে যদি কোনো মামলায় শাস্তিপ্রাপ্ত না হন ও নির্বাচন করার যোগ্য থাকেন তাহলে তাকেও তার দল নিয়ে নির্বাচনের আসার সুযোগ করে দেবে সরকার। ওই সংসদে প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ও প্রধানমন্ত্রীর বোন শেখ রেহানাকে সংসদ সদস্য হিসাবে আনা হতে পারে। খালেদা জিয়া নির্বাচনে তার বিএনপি ও জোট নিয়ে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপির একটি অংশ, ২০ দলীয় জোটের বিভিন্ন নেতারা আলাদা করে নির্বাচনে যাতে অংশ নেন সেই চেষ্টাই করা হবে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ১৫৪টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় সরকার দেশে-বিদেশে প্রচণ্ড রকম সমালোচনার মুখে পড়ে। সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার জন্য আন্তর্জাতিক মহল থেকেও চাপ আসছে। সরকার আগাম নির্বাচন করতে না চাইলেও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন যথাসময়ে করতে চাইছে।
0 comments:
Post a Comment