InstaForex

ইউরোপে অভিবাসীদের কাফেলা

ইউরোপে অভিবাসীদের কাফেলা


Migrant
হাসনাত আবদুল হাই : উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং দণি এশিয়ার কিছু দেশ থেকে ইউরোপে বে-আইনিভাবে অভিবাসীদের যাত্রা শুরু হয়েছে কয়েক বছর আগেই। এদের প্রায় সবাই ছিল ইংরেজিতে যাকে বলে ইকোনমিক মাইগ্র্যান্টস। রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক কারণেই এরা অভিবাসী হয়ে ভাগ্যান্বেষণে ইউরোপে পাড়ি দিয়েছিল। সঙ্ঘবদ্ধ চোরাকারবারীর দল সাহায্য করেছিল তাদের ভূমধ্যসাগর অতিক্রম করে ইউরোপে পৌঁছাতে। ভাঙা জাহাজ এবং অবহেলার শিকার হয়ে অভিবাসীদের অনেকের সলিল সমাধি হয়েছে। এ বছরের জুলাই মাস থেকে যেভাবে দলে দলে অভিবাসীরা ইউরোপে যেতে শুরু করেছে তা অভূতপূর্ব। আগের অভিবাসীদের সঙ্গে এদের বেশ মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এদের অধিকাংশই রাজনৈতিক বিশেষ করে যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণে ছিন্নমূল হয়ে নিরাপদ নতুন জীবনের সন্ধানে ইউরোপ যাত্রা করেছে। এরা সিরিয়া, ইরাক এবং আফগানিস্তানের অধিবাসী। সবগুলো দেশই যুদ্ধ-বিধ্বস্ত এবং সেখানে যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। আগের মত কেবল কম বয়সের পুরুষ নয়, পিতা ও নারীসহ পুরো পরিবার যোগ দিয়েছে অভিবাসীদের কাফেলায়। এ যেমন মানবজাতির কঠিন সময়ে দেশান্তরী হওয়ার চিরন্তন ছবি। পায়ে হেঁটে, নৌকায় করে, ভাঙা জাহাজে বসে এরা উপস্থিত হয়েছে গ্রিসের দ্বীপগুলোতে। সেখান থেকে গ্রিস হয়ে বলগান এলাকার দেশগুলো পায়ে হেঁটে অতিক্রম করে তারা উপস্থিত হয়েছে হাঙ্গেরি। জুন মাসেই এদের সংখ্যা ছিল দেড় লাখের ওপর। তাদের গন্তব্য হাঙ্গেরি নয়, তারা হাঙ্গেরি হয়ে যেতে চেয়েছে জার্মানি এবং সুইডেন সেখানে অভিবাসীদের জন্য সহানুভূতি রয়েছে এবং অর্থনৈতিক সুযোগও আকর্ষণীয়। অবশ্য দণিপন্থি বর্ণবাদীরা সেসব দেশেও তৎপর এবং বিপুল সংখ্যায় অভিবাসীদের আসতে দেখে প্তি হয়ে উঠেছে। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল স্টেটসম্যান সুলভ মনোভাব নিয়ে শরণার্থীদের গ্রহণ করার পে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে এ বছর প্রায় আট লাখ অভিবাসী জার্মানিতে আশ্রয় পাবে। এই সংখ্যা হবে ২০১৪ সালে জার্মানিতে আশ্রয় পাওয়া শরণার্থীদের তিন গুণ। অ্যাঞ্জেলা মার্কেল ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোকে তাদের সাধ্য অনুযায়ী শরণার্থীদের গ্রহণ করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে সকল দেশের সরকার একমত হতে পারেনি। মাথাপিছু আয় এবং দেশের আয়তন অনুযায়ী কোটা নির্ধারণের ফর্মুলা গ্রহণ করতে তারা অনিচ্ছুক। বাধ্যতামূলক কোটা নয়, ঐচ্ছিকভাবে সর্বমোট ৩২০০০ শরণার্থী গ্রহণের পে এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইউরোপে ইতোমধ্যেই দেড় লাখের বেশি অভিবাসী হতে ইচ্ছুক, এমন নর-নারী ও শিশুরা এসে পৌঁছেছে। যাদের ভাগ্য ভালো নয়, তারা যাত্রাপথে মৃত্যুবরণ করেছে। ভিয়েনায় যখন অ্যাঞ্জেলা মার্কেল অন্যান্য ইউরোপীয় নেতাদের নিয়ে অভিবাসী সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা করছেন ঠিক সেই সময় ভিয়েনার অদূরে একটি ভাঙা ভ্যান লরির ভেতর ৭১ জন শিশু, নারী ও পুরুষের মৃতদেহ আবিষ্কার করে পুলিশ। এরা বন্ধ ভ্যানে দম বন্ধ হয়ে মারা গেছে। এই ঘটনা এবং অভিবাসীদের মৃতদেহের ছবি চাঞ্চল্য ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এর উল্লেখ করে এঞ্জেলা মার্কেল বলেছেন যে, অভিবাসীরা ইউরোপের মূল্যবোধের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। মানবিকতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে। তার সঙ্গে একমত হয়েছেন ইটালি ও ফ্রান্সের সরকার প্রধান। কিন্তু কিভাবে বন্যার গ্রোতের মত আসতে থাকা অভিবাসীদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা যাবে এ নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে সবাইকে। কান্ত, রোগাক্রান্ত, অভুক্ত অভিবাসীরা মানবেতর জীবনের মুখোমুখি হয়েও গন্তব্যের দেশে পৌঁছাতে বদ্ধপরিকর। হাঙ্গেরি তার সীমান্তে দেড়শ মাইল বরাবর রেজরওয়ারের প্রাচীর তুলেও তাদের হুঙ্কার অভিযাত্রা বন্ধ করতে পারেনি। ত-বিত হয়েও শরণার্থীরা রেজর ওয়ারের দেয়ালের ভেতর দিয়ে হাঙ্গেরি অতিক্রম করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসী আইন অনুযায়ী তারা প্রথম যে দেশে এসে উপস্থিত হবে সেখানেই নিবন্ধিত হতে হবে। অভিবাসীরা এই নিয়ম মানতে নারাজ। তারা ভিসা না থাকলেও গ্রিস, ম্যাসেডনিয়া ও হাঙ্গেরি হয়ে জার্মানি যেতে বদ্ধপরিকর। হাঙ্গেরিয় আন্তর্জাতিক রেলস্টেশন কেলেটিতে তারা আশ্রয় নিয়েছে এবং ট্রেনের জন্য অপো করছে। হাঙ্গেরির কর্তৃপ স্টেশন থেকে তাদের সরিয়ে নেবার পর শান্তিপূর্ণ বিােভের মুখে আবার স্টেশন খুলে দিয়েছে। এই পর্যন্ত হাঙ্গেরিয় পুলিশ বেশ ধৈর্য ও নমনীয়তার পরিচয় দিয়েছে। তাদের পাশাপাশি প্রশংসা অর্জন করেছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা যারা সাধ্য অনুযায়ী শরণার্থীদের মধ্যে খাবার ও পানীয় সরবরাহ করে যাচ্ছে। প্রয়োজনের তুলনায় যা দেয়া হচ্ছে তা সামান্যই এবং আশ্রয় বলতে কঠিন মেঝেতে শোয়ার জায়গা ছাড়া আর কিছু নেই। শরণার্থীরা সামান্যতেই সন্তুষ্ট। অসীম তাদের ধৈর্য এবং অটুট তাদের সঙ্কল্প। ইউরোপের পশ্চিম ও মধ্য অঞ্চলে যখন এমন চাঞ্চল্যকর এবং বিদ্বেষজনক ঘটনা ঘটছে তার পাশাপাশি একই সময়ে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের সীমান্তে দেখা দিয়েছে তীব্র উত্তেজনা। এখানে অভিবাসীদের মধ্যে যারা আগেই এসে পৌঁছেছে তারা ট্যানেল অতিক্রম করে ব্রিটেনে প্রবেশের চেষ্টা করছে। ব্রিটেন কট্টর ইমিগ্রেশন বিরোধী। ব্রিটিশ সরকার কোনো যুক্তিতেই তাদের গ্রহণ করতে রাজী নয়। অভিবাসীরা মরিয়া হয়ে টানেলের ট্রেন অবরোধ করে রেখেছে। পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন তার বক্তৃতায় বলেছেন অভিবাসী সমস্যার সমাধান তাদের গ্রহণ করার মধ্যে নেই। তাদের দেশ যেমন সিরিয়ায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। ইরাকের েেত্রও একই কথা প্রযোজ্য। ডেভিড ক্যামেরন তার এই উক্তি দ্বারা নিজের এবং পশ্চিমা দেশগুলোর অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছেন। ঘরবাড়ি ত্যাগ করে ছিন্নমূল হয়ে যেসব পিতা, নর-নারী ইউরোপে এসেছে এবং আসছে তারা কখনোই অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়াতো না যদি আমেরিকা ও তার দোসর পশ্চিমা দেশগুলো আফগানিস্তান ও ইরাক আক্রমণ করে যুদ্ধেেত্র পরিণত না করতো। সিরিয়া তারা আক্রমণ করেনি কিন্তু গৃহযুদ্ধে ইন্ধন জুগিয়ে একই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এইসব দেশের মানুষ সুখে-দুঃখে মোটামুটি স্বাভাবিক জীবন-যাপন করছিল। তারা অভাব-অনটনে অথবা রাজনৈতিক স্বাধীনতার অবর্তমানেও কখনোই দেশ ত্যাগের কথা ভাবেনি। বিচ্ছিন্নভাবে কেউ কেউ হয়তো দেশ ত্যাগ করেছে কিন্তু সপরিবারে, দলে দলে কখনো করেনি। তারা যে আজ দেশত্যাগী এর জন্য আমেরিকা আর ইংল্যান্ডই দায়ী। অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ কমবেশি তাদের সহযোগিতা করেছে। এখন তাদের কৃতকর্মের ফল তারা পেতে শুরু করেছে। চরমপন্থি ইসলামের জন্ম তারাই দিয়েছে। বিপুল সংখ্যায় অভিবাসীদের বিদেশ যাত্রার পেছনেও তাদেরই যুদ্ধবাজ নীতি কারণ হিসেবে কাজ করেছে। আশ্চর্যের বিষয় কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্তের জন্য ইউরোপের কোনো কোনো দেশ যেমন জার্মানি পরবর্তীতে সাহায্য করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে তখন আমেরিকা একেবারেই চুপ। আমেরিকার ভাব দেখে মনে হচ্ছে এটা যেন ইউরোপের সৃষ্ট সমস্যা, তার কোনো দায় নেই। অথচ সেই-ই আসল নাটের গুরু, প্রধান হোতা। ছিন্নমূল শরণার্থীদের সাহায্যে তারই এগিয়ে আসা উচিত সবার আগে। শরণার্থী সমস্যায় ইউরোপ যখন দিশেহারা তখন আমেরিকার নিশ্চুপ থাকা তার নৈতিক অধঃপতনের কথাই জানিয়ে দিচ্ছে।

লেখক : কথাশিল্পী ও সাবেক সচিব

Share on Google Plus

About Unknown

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment