ক্যাসিনোতে বাংলাদেশিদের ৫০০ কোটি টাকা
সিঙ্গাপুরের ক্যাসিনো মেরিনা বে স্যান্ডস (এমবিএস)এর পাশে অনেক জুয়াড়ীকেই দেখা যায়। তবে স্বাভাবিক নয়, অনেকটা মলিন চেহারাতেই বেশিরভাগ লোককে দেখা যায়। এখানে আসা বেশিরভাগ জুয়াড়ীই ভারতীয়, মালয়েশীয়, ইন্দোনেশীয়, চীনা। পিছিয়ে নেই বাংলাদেশিরাও। সেখানে রয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার বর্গফুটের জুয়ার আসর। গেমিং মেশিন রয়েছে আড়াই হাজার ও টেবিল ৬০০। আর এসব টেবিলে বছরে শুধু মাত্র বাংলাদেশিদের কাছ থেকেই ৫০০ কোটি টাকা চলে যাচ্ছে। জানা গেছে, সিঙ্গাপুরের ঐ ক্যাসিনেতে প্রতি বছর ৩ বিলিয়ন ডলারের মুনাফা করে এমবিএস। প্রবাসীদের পাশাপাশি বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরাও নিয়মিত ক্যাসিনোয় এসে অর্থ দিয়ে যাচ্ছেন। বড় শিল্পপতিরাও এখানে এসে টাকা উড়িয়ে দেশে ফেরেন। প্রবাসীদের পাশাপাশি বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরাও নিয়মিত ক্যাসিনোয় এসে অর্থ দিয়ে যাচ্ছেন। শুধু যে বিত্তশীলরাই এখানে যাচ্ছেন তা নয়। বাংলাদেশি একজন নির্মাণ শ্রমিক রুবেল, দুই মাসের কষ্টে অর্জিত ৮০০ ডলার মাত্র ২ ঘন্টার জুয়ায় শেষ করেন। ঘটনাটি ঘটেছে গত বুধবার সিঙ্গাপুরের মেরিনা বে স্যান্ডস (এমবিএস) ক্যাসিনোতে। এর পাশে বসেই কাঁদছিলেন রুবেল। তিনি জানান, ২ মাস ধরে যে ৮০০ ডলার তিনি জমিয়েছেন তা বাড়িতে পাঠানোর কথা ছিল তার। কিন্তু এর আগেও এখানে এসে ডলার খুঁইয়েছেন তিনি। তাই আগের লোকসান পুষিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হায়রে ভাগ্য, সহায় হলো না রুবেলের। ‘বহুবার প্রতিজ্ঞা করেছি, আর ক্যাসিনো নয়। কিন্তু হাতে অর্থ এলেই চলে আসি। সব খুঁইয়ে ঘরে ফিরতে হয়। মাঝে মধ্যে জিতলেও তা নগণ্য। তিন বছর ধরে লোকসান ওঠানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু সফল হইনি। বরং লোকসানের অঙ্কই কেবল বেড়েছে। গত তিন বছরে ২০ হাজার ডলারের মতো ক্যাসিনোয় খুঁইয়েছি।’- এমটিই বলেন রুবেল। রুবেল একা নন। এমবিএস ক্যাসিনোয় প্রতিদিন আসছেন শতাধিক বাংলাদেশি। ক্যাসিনোর ফাঁদে পড়ে প্রতিদিন হারাচ্ছেন তাদের কষ্টার্জিত অর্থ। এমবিএসের বিভিন্ন টেবিল ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ টেবিলে প্রতিবার বেটে ১০০ ডলারের নিচে খেলার সুযোগ নেই। তবে লাখ ডলার বেটেরও সুযোগ রয়েছে। তবে শ্লট মেশিনে ৫-১০ সেন্ট দিয়েও খেলার সুযোগ রয়েছে। সেক্ষেত্রে কমপক্ষে ৫০ ডলার মেশিনে জমা দিয়ে খেলা শুরু করতে হবে। অতিথিদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকে ক্যাসিনো। আর বিদেশিদের কারণেই মূলত টিকে আছে এমবিএস। সিঙ্গাপুরের লক্ষাধিক বাংলাদেশির মধ্যে নিয়মিত ক্যাসিনোয় যাতায়াত করেন ২০ হাজারের মতো। তাদের সরব উপস্থিতিতেই জমে ওঠে এমবিএসের জুয়ার আড্ডা। সিঙ্গাপুর প্রবাসী নরসিংদীর ইউসুফ মিয়া বলেন, ক্যাসিনো এখন বাংলাদেশি কমিউনিটির অন্যতম সামাজিক সমস্যা। কোনো কোনো কোম্পানি শ্রমিকদের ক্যাসিনোয় যাওয়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। কারণ ক্যাসিনোগামী শ্রমিকদের কাজে মনোযোগ থাকে না। তারা ঘন ঘন কাজে অনুপস্থিত থাকেন। ইউসুফ মিয়া বলেন, সিঙ্গাপুরে সহস্রাধিক বাংলাদেশি রয়েছেন, যারা বছরের পর বছর সিঙ্গাপুরে থাকলেও বাড়ির সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। সারা বছর কাজ করলেও টাকার অভাবে দেশে যেতে পারেন না তারা। কাজ করেন মূলত ক্যাসিনোর জন্য। জানা গেছে, প্রতিদিন কয়েক হাজার বাংলাদেশি বড়লোক হওয়ার আশায় ক্যাসিনোয় আসেন। বেশির ভাগই অর্থ হারিয়ে ঘরে ফেরেন। মাসের ১০ তারিখের পর সংখ্যা আরো বাড়ে। বেতন পেয়ে পুরো মাসের অর্থই ক্যাসিনোয় দিয়ে আসেন। ক্যাসিনোর প্রতি আসক্তির কারণে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছেন হাজারো প্রবাসী। ক্যাসিনোতেই কথা হয় নরসিংদীর সাঈদ, ফরিদপুরের জোবায়ের ও পাবনার হেলালের সঙ্গে। তারা বলেন, বাংলাদেশি নির্মাণ শ্রমিকদের ৫০ শতাংশ নিয়মিত ক্যাসিনোয় আসে। জুয়ায় হেরে বেশির ভাগই মন খারাপ করে ঘরে ফেরে। কেবল নির্মাণ শ্রমিক নন, বাংলাদেশি নামিদামি ব্যবসায়ীও এমবিএস ক্যাসিনোয় আসেন। হাজার হাজার ডলার দিয়ে যান। এছাড়া সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি পেশাজীবী যারা ভালো রোজগার করেন, তারাও নিয়মিত ক্যাসিনোয় ঢুঁ মারেন। ছুটির দিনে জুরং ও জু-কন থেকে জাহাজ নির্মাণ শ্রমিকরাও চলে আসেন ক্যাসিনোর টানে। এমবিএস ক্যাসিনোয় পাঁচ বছর ধরে নিয়মিত আসেন মুন্সীগঞ্জের আবুল হোসেন। তিনি বলেন, আগে সপ্তাহে একদিন আসতাম। এখন নিয়মিত আসি। পকেটে ১০০ ডলার থাকলেই এখানে চলে আসি। বেশির ভাগ দিন হেরে ঘরে ফিরি। যেদিন ভাগ্য ভালো হয়, ১০০-৫০০ ডলার পকেটে ওঠে। কিন্তু এমনটা মাসে দু-একবারের বেশি ঘটে না। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিঙ্গাপুরের নাগরিকদের সুরক্ষায় সরকার তাদের জন্য এন্ট্রি ফি ১০০ ডলার ধার্য করে দিয়েছে। তাই ধনী যারা, তারাই কেবল সেখানে যেতে পারেন। সাধারণ নাগরিকদের পক্ষে ১০০ ডলার ফি দিয়ে নিয়মিত যাওয়া সম্ভব নয়। তবে বিদেশিরা কোনো ফি ছাড়াই যেতে পারেন। এ কারণে এমবিএস ক্যাসিনোয় বিদেশির সংখ্যাই বেশি। উল্লেখ্য, ২০১০ সালে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে এমবিএস ক্যাসিনো নির্মাণ করা হয়।

0 comments:
Post a Comment